জুমার খুতবাঃ নবীজির ﷺ জন্ম তারিখ ও ঈদে মিলাদুন্নবী - দৈনিক সত্য প্রকাশ

দৈনিক সত্য প্রকাশ

প্রতিদিনের বিভিন্ন সত্য খবর নিয়ে আমাদের এই আয়োজন। বস্তুনিষ্ঠ খবর জানতে আমাদের ওয়েবসাইটে চোখ রাখুন। -ধন্যবাদ।

শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬

জুমার খুতবাঃ নবীজির ﷺ জন্ম তারিখ ও ঈদে মিলাদুন্নবী

 

নবীজির ﷺ জন্ম তারিখ ও ঈদে মিলাদুন্নবী

الحمد لله وكفى و سلام على عباده الذين اصطفى. أما بعد! فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم ، بسم الله الرحمن الرحيم- {وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ} [الحشر: ٧] عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ، فَهُوَ رَدٌّ» صحيح البخاري (٣/ ١৮৪)

শুরুর কথা: রবিউল আউয়াল মাস বেশ কিছু কারণে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। এ মাসটি ইতিহাসের অনেক কিছুর সাক্ষী হয়ে আছে। পবিত্রতম এ মাসে মা আমিনার কোল আলোকিত করে পৃথিবীতে আগমন করেন বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তার আগমনে সজীবত ফিরে পায় পৃথিবী ও পৃথিবীর মানুষগুলো। দেখতে শুরু করে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। পৃথিবীতে তাঁর এই আগমনকে বলা হয় ‘মিলাদুন্নবী’। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনীকে পরিভাষায় বলা হয় ‘সীরাত’। জন্ম-আলোচনা যেহেতু নবীজীবনেরই একটি অংশ-বিশেষ তাই এ দৃষ্টিকোণ থেকে এটিও সীরাতেরই অংশ। আজকে আমরা শুধু নবীজির মিলাদ (জন্ম) এবং এ সংক্রান্ত সমাজে প্রচলিত বিদআত বা বর্জনীয় কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো, বি তাওফীকিল্লাহি তায়ালা।

নবীজির বংশমর্যাদা

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরবের শ্রেষ্ঠ ও সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। এই বংশের শ্রেষ্ঠত্ব আরবের সব শ্রেণির মানুষ একবাক্যে স্বীকার করত। এমনকি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরম দুশমন কাফিররাও তা কখনো অস্বীকার করেনি। আবু সুফিয়ান রাযি. ইসলাম গ্রহণের বহু আগে রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, "هُوَ فِيْنَا ذُوْ نَسَبٍ" "মুহাম্মাদ আমাদের মধ্যে খুবই সম্ভ্রান্ত বংশের লোক"। তা শুনে সম্রাট বলেন, "كَذَلِكَ الرُّسُلُ تُبْعَثُ فِيْ نَسَبِ قَوْمِهَا" ‘প্রকৃতপক্ষে রাসুলগণকে তাঁদের কওমের উচ্চ বংশেই পাঠানো হয়ে থাকে’। (সহিহ বুখারী ৭)

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশমর্যাদা নিয়ে বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। নিম্নে আমরা কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করছি।

১. পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বংশ রাসুলের বংশ: নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বংশ। হাদিস শরীফে এসেছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إِنَّ اللَّهَ خَلَقَ الْخَلْقَ فَجَعَلَنِي فِي خَيْرِهِمْ فِرْقَةً، ثُمَّ جَعَلَهُمْ فِرْقَتَيْنِ فَجَعَلَنِي فِي خَيْرِهِمْ فِرْقَةً، فَجَعَلَنِي فِي خَيْرِهِمْ قَبِيلَةً، ثُمَّ جَعَلَهُمْ بُيُوتًا فَجَعَلَنِي فِي خَيْرِهِمْ بَيْتًا وَخَيْرِهِمْ نَسَبًا. “আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি কুলকে সৃষ্টি করে আমাকে উত্তম দলের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তিনি উত্তম দলকে বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত করে আমাকে উত্তম গোত্রের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তিনি উত্তম গোত্রকে বিভিন্ন ঘরে বিভক্ত করে আমাকে উত্তম ঘর ও উত্তম বংশের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।” (সুনানে তিরমিযী ৩৫৩২)

২. নবীজির বংশপরম্পরায় কখনো পাপযুক্ত হয়নি: নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশের ঊর্ধ্বতন নারী-পুরুষ সকলেই ছিলেন উত্তম চরিত্রের অধিকারী। তাদের চরিত্রে কোন ধরনের কালিমা পড়েনি। এই বংশপরম্পরায় কখনো পাপযুক্ত হয়নি। হাদিস শরীফে এসেছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «خَرَجْتُ مِنْ نِكَاحٍ، وَلَمْ أَخْرُجْ مِنْ سِفَاحٍ، مِنْ لَدُنْ آدَمَ إِلَى أَنْ وَلَدَنِي أَبِي وَأُمِّي» “আদম আ. থেকে আমার পর্যন্ত আমার বংশে কোনো ব্যভিচার নেই। সবই পবিত্র বিবাহবন্ধনের মাধ্যমে। এ পবিত্র বন্ধন থেকেই আমি জন্মেছি”। (আল মুজামুল আওসাত ৪৭২৮)

অতএব, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশকে শ্রেষ্ঠ বংশ হিসেবে স্বীকার করা ঈমানের দাবি।

নবীজির জন্ম তারিখ

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের বছর ও মাস মোটামুটি নিশ্চিতভাবে জানা থাকলেও তারিখের ব্যাপারে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। আমরা নির্ভরযোগ্য ইতিহাস ও সীরাতগ্রন্থ থেকে বিষয়টি খোলাসা করার চেষ্টা করবো, ইন-শা-আল্লাহ। জন্ম তারিখের ক্ষেত্রে চারটি বিষয় মুখ্য হয়ে থাকে। বছর-মাস-বার ও তারিখ। আমরা এই ধারাবাহিকতায় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মতারিখ বিষয়ক বিবরণগুলো অতি সংক্ষেপে তুলে ধরছি..

বছর: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আমুল ফিল’ তথা ইয়ামানের বাদশা আবরাহা বিশাল হস্তীবাহিনী নিয়ে কাবা-ঘর ধ্বংস করতে আসে পরিণামে আল্লাহ তায়ালা আযাব দিয়ে তাদের ধ্বংস করে দেন। এই ঘটনা যে বছর ঘটেছিল সে বছর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্মগ্রহণ করেন। হযরত কাইস ইবনে মাখরামা রাযি. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, "وُلِدْتُ أَنَا وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَامَ الفِيلِ" “আমি এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুইজন আমুল কীলে জন্মগ্রহণ করি”। (সুনানে তিরমিযী ৩৬১৯)

তবে বছরের কোন সময় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্মগ্রহণ করেছেন তা নিয়ে কয়েকটি মত পাওয়া যায়। কারো বক্তব্য হলো, এই ঘটনার ত্রিশ দিন পর, আবার কেউ বলেছেন চল্লিশ দিন পর, কারো বক্তব্য হলো, পঞ্চাশ দিন পর। ইমাম ইবনু কাসীর রাহি. বলেন, "وَهُوَ أَشْهَرُ" “এটিই অধিকাংশের মত”। অর্থাৎ হস্তী বাহিনী ধ্বংসের পঞ্চাশ দিন পর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্মগ্রহণ করেন। (সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ/৩৩৫)

মাস: নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রবিউল আউয়াল মাসে জন্মগ্রহণ করেছেন এব্যাপারে অধিকাংশ ঐতিহাসিকগণ একমত পোষণ করেছেন এবং এটিই প্রসিদ্ধ ও বিশুদ্ধ মত। ইমাম ইবনে কাসীর রহি.বলেন, "الْجُمُهُورُ عَلَى أَنَّ ذَلِكَ كَانَ فِي شَهْرِ رَبِيعِ الْأَوَّلِ" “অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও সীরাত রচয়িতার মতে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম হয়েছিল রবিউল আউয়াল মাসে”। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৩/৩৭৪)

বার ও সময়: নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোমবার দিন সুবহে সাদিকের সময় জন্মগ্রহণ করেন। সময় নিয়ে সামান্য মতপার্থক্য থাকলেও সোমবার সম্পর্কে কারো কোন দ্বিমত নেই। কারণ এটি সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। হাদিস শরিফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি সোমবার দিন রোজা রাখতেন। তাঁকে রোযা রাখার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে, তিনি বলেন, "ذَاكَ يَوْمٌ وُلِدْتُ فِيهِ" ‘এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি’। (সহিহ মুসলিম ১১৬২)

তারিখ: নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম রবিউল আউয়াল মাসে হয়েছিল এবং তা সোমবার দিন ছিল এটি মোটামুটি নিশ্চিত। তবে কত তারিখে হয়েছে এ বিষয়টিতে অনেক মতপার্থক্য রয়েছে। নিম্নে আমরা অধিক প্রসিদ্ধ কয়েকটি তারিখ নিয়ে ইমাম ও ঐতিহাসিকগণের মতামত তুলে ধরছি..

২ই রবিউল আউয়াল: বিখ্যাত তাবেয়ী আতা ইবনে আবি রাবাহ এ মতটি ব্যক্ত করেছেন। ইমামদের মধ্যে হাফেষ যয়নুদ্দীন ইরাকী, হাফেয আবুল হাজ্জাজ মিযযী এ মত গ্রহণ করেছেন। মিযযী রাহি বলেন, এটিই প্রসিদ্ধ মত। আল্লামা আব্দুর রউফ মুনাবী রাহি. বলেন, “তাঁর জন্ম রবিউল আউয়াল মাসের দুই তারিখে সুবহে সাদিকের সময় হয়েছে। অধিকাংশের মতে এটিই সর্বাধিক বিশুদ্ধ মত। (আল উজালাসাতুস সানিয়্যাহ ৫২)

৮ই রবিউল আউয়াল: এ মত অবলম্বন করেছেন সাহাবী আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাযি. যোবায়ের ইবনু মুতইম রাযি. ও বিখ্যাত তাবেয়ী ইকরিমা ইবনে আব্দুল্লাহ রাহি.। (জামিউল আসার ২/৪৯৭) অধিকাংশ ইমাম ও মুহাদ্দিসগণ এ মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিম্নে আমরা কয়েকজন ইমামের বক্তব্য তুলে ধরছি...

১. ইমাম ইবনে কাসীর রাহি বলেন, ইবনে আব্দুল বারসহ অনেকেই এ মতটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন, حَكَاهُ الْحُمَيْدِيُّ عَنِ ابْنِ حَزْمٍ. وَرَوَاهُ مَالِكٌ وَعُقَيْلٌ وَيُونُسُ بْنُ يَزِيدَ وَغَيْرُهُمْ عَنِ الزُّهْرِيِّ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ جُبَيْرِ بْنِ مُطْعِمٍ وَنَقَلَ ابْنُ عَبْدِ الْبَرِّ عَنْ أَصْحَابِ التَّارِيخِ أَنَّهُمْ صَحَّحُوهُ وَقَطَعَ بِهِ الْحَافِظُ الْكَبِيرُ مُحَمَّدُ بْنُ مُوسَى الْخَوَارَزْمِيُّ وَرَجَّحَهُ الْحَافِظُ أَبُو الْخَطَّابِ بْنُ دِحْيَةَ. “এ তারিখই হুমাইদী ইবনু হায়াম থেকে বর্ণনা করেছেন। ইমাম মালেক, উকাইল, ইউনুস ইবনে ইয়াযিদ যুহরী সূত্রে মুহাম্মাদ ইবনে যুবাইর ইবনে মুতইম থেকে বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবনু আব্দিল বার তৎকালীন জ্যোতির্বিদদের উদ্ধৃতিতে বলেছেন তারা এ মতটিকেই বিশুদ্ধ বলেছেন। এ মতকে অকাট্যরূপে পেশ করেছেন হাফেযে কাবীর মুহাম্মাদ বিন মূসা আল-খুয়ারিজমী। এটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন হাফেষ আবুল খাত্তাব ইবনু দিহহীয়া”। (আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া ২/৩২০)

২. ইমাম কাসতাল্লানী রাহি. বলেন, "وَهُوَ اخْتِيَارُ أَكْثَرِ أَهْلِ الْحَدِيثِ" “অধিকাংশ আহলে ইলম এমতটি গ্রহণ করেছেন।” (আসসীরাতুল হালাবিয়া ১/৮৫)

৩. ইবনে হাজার আসকালানি রাহি. আট তারিখের মত ব্যক্ত করে বলেন, "إِنَّهُ مُقْتَضَى أَكْثَرِ الْأَخْبَارِ" “এ মতটিই অধিকাংশ বর্ণনার দাবি”। (সুবুলুল হুদা ওয়াররাশাদ ১/৩৩৪)। এছাড়াও অধিকাংশ মুহাদ্দিসীন ও আইম্মায়ে কেরাম এমতটি গ্রহণ করেছেন।

১২ই রবিউল আউয়াল: ইবনে হিশাম রাহি. তার বিখ্যাত সীরাত গ্রন্থ ‘আসসীরাতুন নববিয়্যাহ’-তে উল্লেখ করেন, قَالَ ابْنُ إِسْحَاقَ: وُلِدَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ الاثْنَيْنِ، لِاثْنَتَيْ عَشْرَةَ لَيْلَةً خَلَتْ مِنْ شَهْرِ رَبِيعِ الأَوَّلِ، عَامَ الفِيلِ “ইবনে ইসহাক বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোমবার দিন রবিউল আউয়াল মাসের বার তারিখ হস্তী বাহিনী ধ্বংসের বছর জন্মগ্রহণ করেন”। (সীরাতে ইবনে হিশাম ১/১৫৮)

সীরাত গ্রন্থ সমূহের মধ্যে সীরাতে ইবনে হিশামের ব্যাপক খ্যাতি রয়েছে। এ গ্রন্থে নবীজির জন্মের তারিখ ১২ উল্লেখ থাকায় এ মতটি আস্তে আস্তে প্রসিদ্ধি লাভ করে। নতুবা বাস্তবে প্রাচীন সীরাত ও তারিখের কিতাবে এ মতটিকে প্রসিদ্ধ কোন মত হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। বরং এটি কেবল ইবনে ইসহাকের বক্তব্য। বিপরীতে আট তারিখের ব্যাপারে বেশ কয়েকজন সাহাবা ও তাবেয়ীদের বক্তব্য প্রাচীন প্রায় সব কিতাবেই উল্লেখ রয়েছে। যাহোক, সীরাতে ইবনে হিশামে ১২ই রবিউল আউয়াল নবীর জন্মের কথা উল্লেখ থাকায় পরবর্তীতে এটিই প্রসিদ্ধি লাভ করে।

বারো তারিখ প্রসিদ্ধ হলেও বিশুদ্ধ নয়

১২ই রবিউল আউয়াল নবীজি জন্মগ্রহণ করেছেন মর্মে সমাজে প্রসিদ্ধি পেলেও এটি বিশুদ্ধ মত নয়। এ ব্যাপারে আমরা ইমামদের কয়েকটি বক্তব্য উল্লেখ করছি..

ক. বিশ্ববিখ্যাত হাদিস বিশারদ আল্লামা মুনাবী রাহি. বলেন, বারো তারিখে নবীজির জন্মের বিষয়টি প্রসিদ্ধ, وَلَكِنِ الْأَصَحُّ عِنْدَ الْجُمْهُورِ الْأَوَّلُ কিন্তু অধিকাংশের মতে সর্বাধিক বিশুদ্ধ মত হলো প্রথমটি। (আল উজালাসাতুস সানিয়্যাহ ৫২)

খ. বিখ্যাত হানাফি ফকিহ আল্লামা যাহেদ হাসান কাউসারী রাহি.বলেন, وَ أَمَّا الْقَوْلُ بِأَنَّهُ الْيَوْمُ الثَّانِي عَشَرَ مِنَ الشَّهْرِ فَقَوْلُ مُحَمَّدِ بْنِ إِسْحَاقَ، لَكِنَّهُ غَفَلَ مِنَ السَّنَدِ كَمَا فِي مُسْتَدْرَكِ الْحَاكِمِ، فَيَكُونُ شَأْنُهُ شَأْنَ الْأَقْوَالِ الَّتِي لَا أَسَانِيدَ لَهَا. “বারো তারিখের মতটি মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাকের বক্তব্য। কিন্তু তিনি এর কোন সনদ উল্লেখ করেননি, যেমনটি মুসতাদরাকে হাকিমে রয়েছে। তাই সনদ বিহীন অন্যান্য কথার যে অবস্থা এর অবস্থাও তা-ই। অর্থাৎ এ মতটি গ্রহণযোগ্য নয়”। (মাকালাতুল কাউসারী ৩৬৩)

গ. এমনকি বেরলভী সম্প্রদায়ের আলা হযরত খ্যাত জনাব আহমাদ রেজা খান বেরলভীও বারো তারিখের মতকে সহিহ বলেননি। তার কিতাব ‘নুতকুল হিলাল’ গ্রন্থে লেখেন ‘অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকদের মতে আট তারিখই সহীহ’। এরপর তিনি বলেন, أَقُولُ: وَحِسَابُنَا فَوَجَدْنَا غُرَّةَ الْمُحَرَّمِ الْوَسِيطَةَ عَامَ وِلَادَتِهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ الْخَمِيسِ، فَكَانَتْ غُرَّةُ الْوِلَادَةِ الْكَرِيمَةِ الْوَسِيطَةُ يَوْمَ الْأَحَدِ، وَالْهِلَالِيَّةُ يَوْمَ الْإِثْنَيْنِ، فَكَانَ يَوْمُ الْإِثْنَيْنِ الثَّامِنُ مِنَ الشَّهْرِ، وَلِذَا أَجْمَعَ عَلَيْهِ أَصْحَابُ الزَّيْجِ. وَمُجَرَّدُ مُلَاحَظَةِ الْغُرَّةِ الْوَسِيطَةِ يُظْهِرُ اسْتِحَالَةَ سَائِرِ الْأَقْوَالِ مَا خَلَا الطَّرَفَيْنِ. “আমি হিসাব করে দেখেছি- নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের বছর মুহররম মাসের শুরুর দিন ছিল বৃহস্পতিবার। তাই নবীজির জন্মের মাস রবিউল আউয়ালের প্রথম দিন রবিবার। আর দ্বিতীয় দিন ছিল সোমবার। এ হিসাবে আট তারিখও হয় সোমবার। এ কারণে জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণ এ বিষয়ে একমত হয়েছেন। শুধু মাসের শুরুর দিনের প্রতি লক্ষ্য করলে বুঝা যায় নবীজির জন্মের বিষয়ে দুটি মত দুই ও আট ছাড়া বাকি সবগুলোই অসম্ভব। ” (নুতকুল হিলাল ২১-২২, নবীজির জন্ম তারিখ- শাইখ তাহমীদুল মাওলা ৬৫)

মোটকথা: নির্ভরযোগ্য বর্ণনা মতে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম হয়েছে ‘আমুল কীলে’ অর্থাৎ যে বছর মক্কায় হস্তীবাহিনীর আক্রমণ হয়েছিল সে বছরে। দিনটি ছিল সোমবার। অধিকাংশের মতে সেটি রবিউল আউয়াল মাসের শুরুর দিকে। রবিউল আউয়াল মাসের বারো তারিখ প্রসিদ্ধ হলেও বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য হলে আট তারিখ। দুই তারিখেরও সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বারো তারিখ সবচেয়ে দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য মত।

ঈদে মিলাদুন্নবী

রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখকে কেন্দ্র করে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে আমাদের দেশের কিছু লোক ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ তথা নবীজির জন্ম উপলক্ষে ঈদ পালন করে থাকে। এটিকে কেন্দ্র করে তারা জশনে জুলুস ও উরসুন্নবী, আনন্দ মিছিল- র‍্যালি, শিন্নি বিতরণ, জিলাপী-আমিতি মিলানো, জন্মদিনের কেক কাটা সহ নানান অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে এবং এসব কাজকে তারা নবীপ্রেমের শ্রেষ্ঠ আলামত হিসেবে আখ্যায়িত করে। পাশাপাশি মানুষকে এ ঈদ পালনের জন্য বিশেষ তাগিদ ও উৎসাহ প্রদান করে। আমরা এটির ইতিহাস ও শরয়ী হুকুম তুলে ধরবো ইন-শা-আল্লাহ।

ঈদে মিলাদুন্নবীর আবিষ্কার

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ, পরবর্তী সাহাবী, তাবেয়ীন এবং সালফে সালিহীনের যুগসহ খাইরুল কুরুনের কোন যুগেই ঈদে মিলাদুন্নবীর কোন অস্তিত্ব ছিল না। এটি সর্ব প্রথম ৬০৪ হিজরী সনে ইরাকের মোছেল শহরে বাদশা আবু সাঈদ মুজাফফর কুকুবরী (মৃত্যু: ৬৩০ হিজরী) এবং একজন বেদআতি ও দরবারি আলেম আবুল খাত্তাব উমর ইবনে দিহয়ার মাধ্যমে সর্বপ্রথম এর গোড়াপত্তন হয়। ১২ই রবিউল আউয়াল ভিত্তিক এই অনুষ্ঠানের লক্ষ্য ছিল আনন্দ উৎসব এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য ঈসালে সওয়াব করা। (তারীখে ইবনে খাল্লি-কান-৪/১১৭, ইখতিলাফে উম্মত আওর সীরাতে মুস্তাকীম ৯৬)

এই দরবারি আলেম সম্পর্কে আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রাহি.লেখেন, كَانَ كَثِيرَ الْوَقِيعَةِ فِي الأَئِمَّةِ وَفِي السَّلَفِ «مِنَ الْعُلَمَاءِ خَبِيثَ اللِّسَانِ أَحْمَقَ شَدِيدَ الْكِبْرِ قَلِيلَ النَّظَرِ فِي أُمُورِ الدِّينِ مُتَهَاوِنًا» “সে পরবর্তী ইমাম ও আলেম-উলামাদের সাথে বেআদবী করত। সে ছিল অশ্লীল ভাষী, অহঙ্কারী, নির্বোধ এবং দ্বীন সম্পর্কে সংকীর্ণমনা ও অলস প্রকৃতির।” (লিসানুল মীযান-৪/২৯৬)

ইমাম ইবনু নাজ্জার রাহি. বলেন, "وَقَالَ ابْنُ النَّجَّارِ رَأَيْتُ النَّاسَ مُجْتَمِعِينَ عَلَى كَذِبِهِ" “এই ব্যক্তি মিথ্যাবাদী হওয়ার ব্যাপারে আমি সকলকে ঐক্যবদ্ধ পেয়েছি। ” (লিসানুল মীযান-৪/২৯৫)

তাদের মিলাদ মাহফিলের চিত্র তুলে ধরে আল্লামা ইবনে কাসীর ও আল্লমা ইবনে খাল্লি-কান রাহি. লেখেন, “মিলাদের এ মাহফিলে অত্যন্ত ধুমধামের সাথে নাচ-গানের আসর বসত। وَيُرْقُصُ بِنَفْسِهِ مَعَهُمْ ‘বাদশা নিজেও নাচে অংশগ্রহণ করত’। মাহফিল শেষে যোগদানকারীদের যথোপযুক্ত সম্মানীয় দেওয়া হত। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া - ১৩/১৩৭, তারীখে ইবনে খাল্লি-কান-৪/১১৭-১১৯)

প্রচলিত ঈদে মিলাদুন্নবীর মন্দ দিকগুলো

বর্তমান প্রচলিত ঈদে মিলাদুন্নবীর মৌলিক কিছু মন্দ দিক নিশানদেহির জন্য পৃথকভাবে উল্লেখ করছি..

১. ঈদ নামের সংযোজন: আশ্চর্যের বিষয় হলো, শরীয়তে যার কোন ভিত্তি নেই, সেই মিলাদ মাহফিলের সাথে ইদানিংকালে ঈদ শব্দটিও যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। অথচ ইসলাম উৎসব পালনের জন্য দুটি ঈদ সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে। একটি ঈদুল ফিতর, আর দ্বিতীয়টি হলো, ঈদুল আযহা। এছাড়া অন্য কোন দিনকে ঈদ উৎসব বানাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "لَا تَتَّخِذُوا يَوْمًا عِيدًا" ‘তোমরা অন্য কোন দিনকে ঈদ হিসেবে গ্রহণ করো না’। (মুসান্নাফে আবদির রাযযাক ৭৪৫৩)

২. অপচয় ও নানান বেদআতি কাজ: ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে লক্ষ লক্ষ টাকা অপচয় করে বিপুল আয়োজনে জুলুস ও শানদার মিছিলেরও ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি শিন্নি বিতরণ, জিলাপী-আমিতি মিলানো, জন্মদিনের কেক কাটা, গান-বাজনাসহ নানান শরীয়ত বিরোধী কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করা হয়। এসব আয়োজনের ক্ষেত্রে যুক্তি হিসেবে দেখানো হয় যে, এতে ইসলামের শান-শওকত ও নবীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ পায়। অথচ বাস্তবেঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনে যদি মঙ্গলের কিছু থাকত বা এটি নবীপ্রেমের আলামত হতো, তাহলে সাহাবায়ে কিরাম কোন অবস্থাতেই এ কাজ থেকে বিরত থাকতেন না। কারণ, তাঁরা নবীর জন্য জান-মাল সব কিছু বিসর্জন দিয়েছিলেন এবং তাঁদের কাছে নবীর একটি সুন্নাত উভয় জাহান থেকেও মূল্যবান ছিল।

৩. নবীকে হাযির-নাযির মনে করা: মিলাদপন্থী আলেমদের অনেকে মিলাদ মাহফিলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হাযির-নাযির মনে করে এবং এই ধারণা ব্যাপক করার চেষ্টা চালায়। অথচ শরীয়ত ও যুক্তি উভয় দিক থেকে এ ধারণা অসত্য ও বাতিল। ফিক্বাহ শাস্ত্রবিদগণ এমন আকিদা পোষণকারীদের ‘কাফির’ সাব্যস্ত করেছেন। কারণ, হাযির-নাযির হওয়া কুরআন-হাদিসের আলোকে মহান আল্লাহ তায়ালার একটি বিশেষ গুণ, যা আল্লাহ ছাড়া আর কারো জন্য হতে পারে না।

৪. বিজাতির সাদৃশ্যতা অবলম্বন: ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনের অন্যতম নিন্দনীয় দিক হলো, এতে বিজাতির সাদৃশ্যতা অবলম্বন এবং তাদের অনুকরণ করা হয়, যা শরীয়তের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ। কেননা, এই রসম খ্রীষ্টান ও হিন্দুদের থেকে মুসলিম সমাজে প্রবেশ করেছে। খ্রীষ্টান জাতি প্রতি বছর ২৫ ডিসেম্বর হযরত ঈসা আ.এর জন্ম দিবস পালন উপলক্ষে ক্রিসমাস ডে-এর আয়োজন করে। হিন্দুরাও প্রতি বছর ৮ ভাদ্র শ্রীকৃষ্ণের জন্ম দিবস উপলক্ষে ‘জন্মাষ্টমী’ পালন করে থাকে। এ উপলক্ষে বিরাট জুলুস-মিছিলের আয়োজন করে থাকে।

৫. মিলাদ প্রমাণে জাল হাদিসের আশ্রয় গ্রহণ: প্রচলিত মিলাদ মাহফিলকে প্রমাণ করার জন্য তারা জাল ও বানোয়াট কথাকে হাদিস নামে চালিয়ে দেয়, যা অনেক বড় অপরাধ। কেননা এ মর্মে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঠোর ধমকিবাণী দিয়েছেন। তিনি বলেন, «مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا، فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ» “যে ব্যক্তি ইচ্ছা করে আমার প্রতি মিথ্যা আরোপ করে, সে যেন জাহান্নামে নিজের ঠিকানা বানিয়ে নেয়।” (সহিহ মুসলিম ৩)

৬. নবীজির মৃত্যু দিবসে আনন্দ উদযাপন: ১২ই রবিউল আউয়াল নবীজির জন্মতারিখ এটি অতি দুর্বল মত। পক্ষান্তরে অধিকাংশ ঐতিহাসিক এবং সীরাত বিশেষজ্ঞগণ একথার উপর একমত যে, ১২ ই রবিউল আউয়াল তারিখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দুনিয়া থেকে আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান। যেসব ঐতিহাসিক এবং সীরাত গবেষকগণ এব্যাপারে একমত পোষণ করেন, তাদের কয়েকজনের নাম নিচে উদ্ধৃত করা হলো- ইবনে সাদ হযরত আয়েশা রাযি. এবং হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাযি. থেকে নকল করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ১২ ই রবিউল আউয়াল ইন্তেকাল করেছেন। (তবাক্বাতে ইবনে সাদ- ২/২৭২)। এছাড়া হাফেয যাহাবী রাহি. হাফেয ইবনে কাসীর রাহি. ঐতিহাসিক ইবনে আসীর রাহি. আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রাহি. ইবনে হিব্বান রাহি. ইমাম নববী রাহি. ইবনে জারীর তাবারী রাহি. মোল্লা আলী কারী রাহি. আল্লামা শিবলী নুমানী রাহি. সফীউর রহমান মুবারকপুরী রাহি. আবুল হাসান আলী নদবী রাহি.সহ আরো অনেক ঐতিহাসিক ও সীরাতবিদগণ এ মত পোষণ করেছেন। এমনকি আহমাদ রেজা খান বেরলভীও এমত পোষণ করেছেন যে, নবীজি সা. ১২ই রবিউল আউয়াল ইন্তেকাল করেছেন। তাই পৃথিবীর কোন ধর্মের মূল ব্যক্তির মৃত্যু দিবসে তার প্রকৃত অনুসারীরা কখনো আনন্দ উল্লাস করতে পারে না। বরং এটি সেই মহান ব্যক্তিত্বের বিরোধীদের কাজ হতে পারে।

ঈদে মিলাদুন্নবী পালন সর্বসম্মতিক্রমে বিদআত

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মকে কেন্দ্র করে প্রচলিত ঈদে মিলাদুন্নবীর আয়োজন সম্পূর্ণ বিদআত। কারণ, বিদআত বলা হয়, দ্বীন হিসেবে এমন কোন কাজ করা যা নবী, খোলাফায়ে রাশেদিন, সাহাবি ও তাবেয়ীদের থেকে প্রমাণিত নয়। আল্লামা জুরজানী রাহি. বলেন, البدعة: هي الأمر المحدث الذي لم يكن عليه الصحابة والتابعون، ولم يكن مما اقتضاه الدليل الشرعي “বিদআত: এটি এমন একটি উদ্ভাবিত নতুন বিষয় যা সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীনদের যুগে ছিলনা এবং এর কোন শরয়ী দলিলও নেই।” (আত-তারীফাত ৪৩)

কাজেই ঈদে মিলাদুন্নবীর অস্তিত্ব যেহেতু সাহাবী, তাবেয়ীদের যুগে ছিল না এবং এর স্বপক্ষে শরয়ী কোন দলিল নেই, তাই তা বেদআত বলে গণ্য হবে। আর এ ধরনের নব আবিষ্কৃত সকল বিষয় সম্পূর্ণ বর্জনীয় ও পরিত্যাজ্য। এ ব্যাপারে আম্মাজান আয়েশা রাযি.এর হাদিসটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ» “কেউ যদি আমাদের এই দ্বীনে নতুন কোনো বিষয় উদ্ভাবন করে তবে তা প্রত্যাখ্যাত হবে।” (সহিহ বুখারি ২৬৯৭)। নিম্নে আমরা ঈদে মিলাদুন্নবী বিদআত মর্মে ইমামদের সরাসরি কয়েকটি বক্তব্য তুলে ধরছি..

১. আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রাহি. কে প্রশ্ন করা হয়, মিলাদ অনুষ্ঠান কি বিদআত? না শরীয়তে এর কোন ভিত্তি আছে? জবাবে তিনি বলেন, মিলাদ অনুষ্ঠান মূলতঃ বিদআত। তিন পবিত্র যুগের সালফে সালিহীনের আমলে এর অস্তিত্ব ছিল না। (হিদুয়ার মাআল মালিকী-১৭৭)

২. ইমাম আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ মালেকী রাহি. বলেন, “চার মাযহাবের আলেমগণ মিলাদ অনুষ্ঠান বিদআত মর্মে একমত।” (আল কাউলুল মু’তামাদ ২৫৩)

৩. সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতী খ্যাত শায়েখ আব্দুল আযীয বিন বায রাহি.এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, “কুরআন, সুন্নাহ তথা শরয়ী দলিলমতে ঈদে মিলাদুন্নবীর আয়োজন-অনুষ্ঠান ভিত্তিহীন, বরং বিদআত। এতে ইহুদী-খ্রীস্টানদের সাদৃশ্য পাওয়া যায়। এসব অনুষ্ঠানে মুসলমানদের যোগদান করা নাজায়েয। কেননা, এর দ্বারা বিদআতের সম্প্রসারণ ও এর প্রতি উৎসাহ যোগানো হয়।” (মাজমুউল ফাতাওয়া-৪/২৮৩-২৮৪)

জন্মের খুশিতে ঈদ পালন নয় বরং রোযা রাখা নবীজির শিক্ষা

রাসূলের জন্মদিনে ঈদ নয় বরং ওই দিন সুন্নাহ সম্মত আমল হলো রোযা রাখা। হাদিস শরিফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি সোমবার দিন রোযা রাখতেন। তাঁকে রোযা রাখার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে, তিনি বলেন, "ذَاكَ يَوْمٌ وُلِدْتُ فِيهِ" ‘এই দিনে আমি জন্মগ্রহণ করেছি’। (সহিহ মুসলিম ১১৬২)। তাই কেউ যদি নবীজির জন্মদিন উপলক্ষে কোন আমল করতে চায়, তার জন্য উচিত প্রতি সোমবার রোযা রাখা। এটিই সুন্নাহ সম্মত আমল। এর বিপরীতে প্রচলিত ঈদে মিলাদুন্নবীর কোন আয়োজনে শরিক হওয়া বেদআত। এরূপ কোন বেদআতে লিপ্ত হলে ভয়াবহ পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে।

বিদআতে লিপ্ত হওয়ার ভয়াবহতা

বিদআতে লিপ্ত হওয়া অনেক বড় গোনাহের কাজ। এমন গোনাহে লিপ্ত ব্যক্তির ব্যাপারে শরীয়তে কঠিন ধমকিবাণী ও ভয়াবহ শাস্তির কথা এসেছে। নিম্নে আমরা বিদআতের ভয়াবহ কিছু পরিণাম তুলে ধরছি..

১. বিদআতির আমল কবুল হয় না তার উপর লানত বর্ষণ হতে থাকে: বিদআতে লিপ্ত ব্যক্তি এবং তার সহযোগির ফরজ, নফল কোন ধরনের আমলই কবুল হবে না। বরং তাদের উপর সর্বদা লানত বর্ষণ হতে থাকে। হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় বেদআত প্রচলনকারীদের ব্যাপারে বলেন, فَمَنْ أَحْدَثَ فِيهَا حَدَثًا أَوْ آوَى فِيهَا مُحْدِثًا، فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ وَالمَلاَئِكَةِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ، لاَ يُقْبَلُ مِنْهُ صَرْفٌ وَلاَ عَدْلٌ “যে ব্যক্তি এখানে কোন বিদআতের প্রচলন করবে বা কোন বেদআতিকে আশ্রয় দিবে তার উপর আল্লাহর, ফিরিশতাগণের ও সকল মানুষের লানত। আল্লাহ তায়ালা তার কোন নফল বা ফরজ আমল গ্রহণ করবেন না” (সহিহ বুখারি ৩১৭২)

২. বিদআত হল পাগলা কুকুরের বিষের মতো ভয়ঙ্কর: এই বিদআত যদি কারো জীবনে প্রবেশ করে তাহলে কুকুরের বিষের মতো তার জীবনের সকল অংশকে বিষাক্ত করে ফেলে। হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, وَإِنَّهُ سَيَخْرُجُ مِنْ أُمَّتِي أَقْوَامٌ تَجَارَى بِهِمْ تِلْكَ الْأَهْوَاءُ، كَمَا يَتَجَارَى الْكَلْبُ لِصَاحِبِهِ " وَقَالَ عَمْرٌو : «الْكَلْبُ بِصَاحِبِهِ لَا يَبْقَى مِنْهُ عِرْقٌ وَلَا مَفْصِلٌ إِلَّا دَخَلَهُ» [হুকুম আলবানী: হাসান] “শীঘ্রই আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোকজনের আবির্ভাব ঘটবে যাদের শরীরের গিরায় গিরায় বিদআত প্রবণতা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়বে যেমনভাবে পাগলা কুকুর কামড় দিলে তার বিষ দংশনকৃত ব্যক্তির শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। তার শরীরের কোনো গিরা বা জোড়া অবশিষ্ট থাকে না যেখানে ওই বিষ ঢুকেনা”। (সুনানে আবি দাউদ ৪৫৯৭)

৩. বিদআতের প্রবর্তক নিজ গোনাহের পাশাপাশি অনুসারীদের গোনাহর বোঝা বহন করবে: হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, مَنْ دَعَا إِلَى هُدًى، كَانَ لَهُ مِنَ الْأَجْرِ مِثْلُ أُجُورِ مَنْ تَبِعَهُ، لَا يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَيْئًا، وَمَنْ دَعَا إِلَى ضَلَالَةٍ، كَانَ عَلَيْهِ مِنَ الْإِثْمِ مِثْلُ آثَامِ مَنْ تَبِعَهُ، لَا يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ آثَامِهِمْ شَيْئًا “যে ব্যক্তি কোন হেদায়েতের দিকে আহবান করবে তাকে তার অনুসারীদের সমান সওয়াব দেওয়া হবে। ওই ব্যক্তির সওয়াব কমিয়ে দেওয়া হবে না। আর যে ব্যক্তি কোন গোমরাহী বা অন্যায়ের দিকে আহবান করবে তাকে তার অনুসারীদের সমান গোনাহ দেওয়া হবে। তবে একারণে ওই ব্যক্তির গোনাহ কমিয়ে দেওয়া হবে না।” (সহীহ মুসলিম ১৬৭৪)

৪. বিদআতে লিপ্ত হলে সুন্নাত উঠিয়ে নেওয়া হয়: বিদআতে লিপ্ত হওয়ার বড় একটি ক্ষতি হলো, এ কারণে দুনিয়া থেকে সুন্নাতকে উঠিয়ে নেওয়া হয়। হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, مَا ابْتَدَعَ قَوْمٌ بِدْعَةً فِي دِينِهِمْ إِلَّا نَزَعَ اللهُ مِنْ سُنَّتِهِمْ مِثْلَهَا ثُمَّ لَا يُعِيدُهَا إِلَيْهِمْ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ [تعليق المحقق] إسناده صحيح “যখনই কোনো জাতি দ্বীন সম্পর্কে কোনো বিদআত সৃষ্টি করে তখনই আল্লাহ তায়ালা তাদের মধ্য হতে সে পরিমাণ সুন্নাত উঠিয়ে নেন। অতঃপর কেয়ামত পর্যন্ত সেই সুন্নাত আর তাদের প্রতি ফিরিয়ে দেন না।” (সুনানে দারেমী ৯৯)

৫. বিদআতির তাওবা কবুল করা হয় না: আল্লাহ তায়ালা বিদআতে লিপ্ত ব্যক্তির তাওবা কবুল করেন না। হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «إِنَّ اللَّهَ حَجَبَ التَّوْبَةَ عَنْ كُلِّ صَاحِبِ بِدْعَةٍ» قَالَ الهَيْثَمِيُّ: رَوَاهُ الطَّبَرَانِيُّ فِي الأَوْسَطِ، وَرِجَالُهُ رِجَالُ الصَّحِيحِ “আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক বিদআতিকে তাওবা করা থেকে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে দেন”। ( মাজমাউয যাওয়ায়েদ ১৭৪৫৭)

৬. বিদআতপন্থী কিয়ামতের দিন হাউজে কাউসারের পানি পাবে না: হাউজে কাউসার এর পাশ থেকে তাদেরকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে। হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «أَنَا فَرَطُكُمْ عَلَى الحَوْضِ، فَمَنْ وَرَدَهُ شَرِبَ مِنْهُ، وَمَنْ شَرِبَ مِنْهُ لَمْ يَظْمَأْ بَعْدَهُ أَبَدًا، لَيَرِدَنَّ عَلَيَّ أَقْوَامٌ أَعْرِفُهُمْ وَيَعْرِفُونَنِي، ثُمَّ يُحَالُ بَيْنِي وَبَيْنَهُمْ» . قَالَ: " إِنَّهُمْ مِنِّي، فَيُقَالُ: إِنَّكَ لاَ تَدْرِي مَا بَدَّلُوا بَعْدَكَ، فَأَقُولُ: سُحْقًا سُحْقًا لِمَنْ بَدَّلَ بَعْدِي" “আমি হাউজে কাউসারের ধারে তোমাদের আগে হাযির থাকবো। যে সেখানে হাযির হবে, সে সেখান থেকে পানি পান করার সুযোগ পাবে। আর যে একবার সে হাউজ থেকে পান করবে সে কখনোই পিপাসিত হবে না। অবশ্যই কিছু দল আমার কাছে হাযির হবে যাদের আমি চিনতে পারবো এবং তারাও আমাকে চিনতে পারবে। কিন্তু এরপরই তাদের ও আমার মাঝে প্রতিবন্ধকতা দাঁড় করে দেয়া হবে। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলবেন, এরা তো আমারই অনুসারী। তখন বলা হবে, আপনি নিশ্চয়ই জানেন না যে, আপনার পর এরা দ্বীনের মধ্যে কি পরিবর্তন করেছে। এ শুনে আমি বলব, যারা আমার পরে পরিবর্তন করেছে, তারা এখান থেকে দূর হোক, দূর হোক।” (সহিহ বুখারি ৭০৫০)

৭. বিদআত জাহান্নামে যাওয়ার কারণ: বিদআতের শেষ পরিণাম হলো জাহান্নাম। হাদিস শরীফে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, وَشَرُّ الْأُمُورِ مُحْدَثَاتُهَا، وَكُلُّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ، وَكُلُّ ضَلَالَةٍ فِي النَّارِ» [حكم الألباني] صحيح “সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো দ্বীনের মধ্যে নব উদ্ভাবিত বিষয়। আর নব উদ্ভাবিত প্রত্যেক বিষয় বিদআত এবং প্রত্যেক বিদআত হল ভ্রষ্টতা আর প্রত্যেক ভ্রষ্টতার পরিণাম জাহান্নাম।” (সুনানে নাসায়ী ১৫৭৮)

সমাপনী কথা: আমাদের জীবনের প্রতিটি কাজ-কর্ম নবীজির সুন্নতের আলোকে সাজাতে হবে। মিলাদ নিয়ে মাতামাতি না করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নবীজির সীরাতের বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে। বিদআত থেকে নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখতে হবে। বেদআতপূর্ণ কাজে কোন ধরনের সহযোগিতা, সমর্থন দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। যারা বিদআতে লিপ্ত তাদেরকে বোঝাতে হবে এবং তাদের হেদায়েতের জন্য দোয়া জারি রাখতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে বিদআতের মতো ভয়াবহ গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন! ইয়া রাব্বাল আলামীন।

আরো দেখুনঃ

স্পেনে মুসলমানদের পতনের কারণ


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here

Pages