স্পেনে মুসলমানদের পতনের কারণ - দৈনিক সত্য প্রকাশ

দৈনিক সত্য প্রকাশ

প্রতিদিনের বিভিন্ন সত্য খবর নিয়ে আমাদের এই আয়োজন। বস্তুনিষ্ঠ খবর জানতে আমাদের ওয়েবসাইটে চোখ রাখুন। -ধন্যবাদ।

সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬

স্পেনে মুসলমানদের পতনের কারণ


স্পেনে মুসলিম শাসনের পতন কোনো একক যুদ্ধের মাধ্যমে বা হঠাৎ করে একদিনে হয়নি। এটি ছিল প্রায় সাড়ে চারশ বছর ধরে চলা এক দীর্ঘ ও ধারাবাহিক রাজনৈতিক, সামরিক এবং অভ্যন্তরীণ ভাঙনের ইতিহাস।

৭১১ খ্রিষ্টাব্দে তারেক বিন জিয়াদের নেতৃত্বে স্পেনে মুসলিম শাসন শুরু হয়, যা ইতিহাসে **আন্দালুস (Al-Andalus)** নামে পরিচিত। স্থাপত্য, বিজ্ঞান ও দর্শনে মুসলিম স্পেন চরম উৎকর্ষ লাভ করলেও অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং উত্তর দিকের খ্রিষ্টান রাজ্যগুলোর ঐক্যবদ্ধ আক্রমণের ফলে ধীরে ধীরে এই সাম্রাজ্য পতনের দিকে এগিয়ে যায়। এই পতন প্রক্রিয়ার মূল ধাপগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

## ১. উমাইয়া খিলাফতের ভাঙন ও 'তায়েফা' যুগের সূচনা (১0৩১ খ্রিষ্টাব্দ)

স্পেনে মুসলিমদের পতনের প্রথম বড় কারণ ছিল তাদের নিজেদের ভেতরের তীব্র রাজনৈতিক কোন্দল। দশম শতকে কর্ডোবা খিলাফতের অধীনে আন্দালুস যখন ক্ষমতার শীর্ষে ছিল, তখনো ভেতরে ভেতরে আরব, বারবার (উত্তর আফ্রিকান মুসলিম) এবং স্থানীয় নবদীক্ষিত মুসলিমদের মধ্যে জাতিগত দ্বন্দ্ব দানা বাঁধছিল।

১0৩১ খ্রিষ্টাব্দে কর্ডোবা খিলাফতের চূড়ান্ত পতন ঘটে এবং পুরো মুসলিম স্পেন প্রায় ৩০টিরও বেশি ছোট ছোট স্বাধীন রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে, যেগুলোকে **'তায়েফা' (Taifa)** বলা হতো। এই রাজ্যগুলো খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পরিবর্তে নিজেদের মধ্যেই যুদ্ধে লিপ্ত থাকত, যা তাদের সামরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল করে দেয়।

## ২. খ্রিষ্টানদের 'রিকনকুইস্টা' বা পুনঃদখল অভিযান

মুসলিমদের এই অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার পূর্ণ সুযোগ নেয় উত্তরের খ্রিষ্টান রাজ্যগুলো (যেমন- ক্যাস্টিল, আরাগন ও নাভার)। তারা স্পেনের মাটি থেকে মুসলিমদের তাড়িয়ে পুরো উপদ্বীপটি আবার খ্রিষ্টান শাসনে ফিরিয়ে আনার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী সামরিক অভিযান শুরু করে, যাকে ইতিহাসে **রিকনকুইস্টা (Reconquest/Reconquista)** বলা হয়।

তায়েফা রাজ্যগুলো খ্রিষ্টানদের আক্রমণ ঠেকাতে না পেরে উত্তর আফ্রিকার মুরাবিতুন (Almoravids) এবং মুওয়াহহিদুন (Almohad) রাজবংশের সাহায্য চায়। তারা এসে সাময়িকভাবে খ্রিষ্টানদের অগ্রগতি রুখে দিলেও, পরবর্তীতে ক্ষমতার কোন্দলে ওলটপালট হয়ে যায়। ১২১২ খ্রিষ্টাব্দে **'লাস নাভাস দে তোলোসা'**-র ঐতিহাসিক যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী খ্রিষ্টান জোটের কাছে মারাত্মকভাবে পরাজিত হয়। এরপর একে একে কর্ডোবা (১২৩৬) এবং সেভিল (১২৪৮)-এর মতো বড় বড় মুসলিম নগরী খ্রিষ্টানদের দখলে চলে যায়।

## ৩. গ্রানাডা আমিরাত এবং চূড়ান্ত পতন (১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দ)

১৩ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পুরো স্পেনে মুসলিমদের শাসন কেবল দক্ষিণ প্রান্তের **গ্রানাডা (Granada)** নামক একটি ছোট অঞ্চলে সংকুচিত হয়ে পড়ে। বনু নাসর রাজবংশ এখানে 'গ্রানাডা আমিরাত' প্রতিষ্ঠা করে আরও প্রায় আড়াইশ বছর মুসলিম শাসন টিকিয়ে রাখে। গ্রানাডার শাসকেরা খ্রিষ্টান রাজাদের মোটা অঙ্কের কর (Tribute) দিয়ে এবং তাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে টিকে ছিল। এই সময়েই তারা বিখ্যাত **আলহামরা প্রাসাদ** নির্মাণ করে, যা আজও মুসলিম স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

কিন্তু ১৪৬৯ খ্রিষ্টাব্দে ক্যাস্টিলের রানী ইসাবেলা এবং আরাগনের রাজা ফার্ডিন্যান্ডের মধ্যে বিয়ের ফলে দুটি শক্তিশালী খ্রিষ্টান রাজ্য একত্রিত হয়ে যায়। তারা পুরো স্পেনে খ্রিষ্টান শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য গ্রানাডা আক্রমণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।

এই চরম সংকটের সময়েও গ্রানাডার শেষ মুসলিম সুলতান **আবু আব্দুল্লাহ (Boabdil)** তাঁর নিজের বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ক্ষমতা দখল করেন। এই গৃহযুদ্ধের কারণে গ্রানাডার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। খ্রিষ্টান বাহিনী টানা কয়েক বছর গ্রানাডা অবরোধ করে রাখার পর, অবরুদ্ধ ও ক্ষুধার্ত নগরীটি আর টিকতে পারেনি। অবশেষে **১৪৯২ সালের ২রা জানুয়ারি** সুলতান আবু আব্দুল্লাহ রাজা ফার্ডিন্যান্ডের কাছে গ্রানাডার চাবি হস্তান্তর করে আত্মসমর্পণ করেন। এর মাধ্যমেই স্পেনে প্রায় ৮০০ বছরের মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে।

## পতনের পর কী ঘটেছিল?

আত্মসমর্পণের চুক্তিতে মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, খ্রিষ্টান শাসকেরা তা রক্ষা করেনি।

 * খুব দ্রুতই শুরু হয় জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ।

 * যারা গোপনে ইসলাম পালন করতেন, তাদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়ার জন্য **'ইনকুইজিশন' (Inquisition)** নামক একটি কুখ্যাত ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।

 * বিপুল পরিমাণ ইসলামিক বইপত্র ও পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলা হয়।

 * ১৬০৯ খ্রিষ্টাব্দে সর্বশেষ **'মরিস্কো'** (জোরপূর্বক খ্রিষ্টান বানানো মুসলিমদের বংশধর)-দেরও সম্পূর্ণভাবে স্পেন থেকে বহিষ্কার করা হয়।

সংক্ষেপে বলতে গেলে—নিজেদের মধ্যকার চরম অহংকার ও গৃহযুদ্ধ, দূরদর্শিতার অভাব এবং প্রতিপক্ষের ঐক্যবদ্ধ পরিকল্পনাই ছিল স্পেনে মুসলমানদের পতনের প্রধান কারণ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here

Pages