জলাশয় শুকানোর পর পুনরায় সেখানে মাছ আসে কিভাবে?
বাংলাদেশ বা যেকোনো নদীমাতৃক দেশের মানুষের কাছে একটি চিরাচরিত রহস্য হলো—যে জলাশয় চৈত্র মাসে শুকিয়ে খটখটে মাটি হয়ে গেল, বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে সেই পানি জমা জলাশয়ে হঠাৎ হাজার হাজার মাছ এল কোথা থেকে? আবার পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অনেক সময় বৃষ্টির সাথে আকাশ থেকেও মাছ পড়ার ঘটনা শোনা যায়। এগুলো কি শুধুই কোনো অলৌকিক ঘটনা, নাকি এর পেছনে রয়েছে নিখাদ বিজ্ঞান?
চলুন, এই সম্পূর্ণ বিষয়টির পেছনের আসল রহস্য ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তিগুলো বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
পার্ট ১: জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ার পর নতুন পানিতে মাছ আসে কীভাবে?
পানি শুকিয়ে গেলে জলাশয়ের ভেতরের মাছগুলো হারিয়ে যায় না, বরং সেগুলো প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে টিকে থাকে এবং সুযোগ পাওয়া মাত্রই আবার ছড়িয়ে পড়ে। প্রধান যে কারণগুলোর জন্য এমনটা ঘটে:
১. কাদার নিচে সুপ্তাবস্থা বা 'এস্টিভেশন' (Aestivation)
আমাদের দেশের কৈ, শিঙি, মাগুর, শোল, গজার, বাইম ও ট্যাংরা জাতীয় দেশীয় মাছের বিশেষ ধরনের 'অতিরিক্ত শ্বাসঅঙ্গ' থাকে। এর সাহায্যে এরা বাতাস থেকে সরাসরি অক্সিজেন গ্রহণ করতে পারে।
যখন পুকুর বা বিলের পানি শুকিয়ে যেতে শুরু করে, তখন এরা কাদার অনেক গভীরে (কখনো ২ থেকে ৪ ফুট পর্যন্ত) নিচে ঢুকে যায়। সেখানে কাদার ভেজা ভাব ব্যবহার করে এরা শরীরের বিপাকক্রিয়া একবারে কমিয়ে দিয়ে এক ধরণের গ্রীষ্মকালীন সুপ্তাবস্থায় চলে যায়। বর্ষার বৃষ্টিতে মাটি নরম হলে এরা কাদা ফুঁড়ে আবার নতুন পানিতে সাঁতার কাটতে শুরু করে।
২. বৃষ্টির পানি ও উজান থেকে স্রোতের প্রবাহ
বর্ষাকালে যখন একটানা ভারী বৃষ্টিপাত হয়, তখন খাল, বিল, নদী ও বড় বড় জলাশয় উপচে পানি চারিদিকে প্রবাহিত হতে শুরু করে। সেই পানির স্রোতে এক পুকুর বা নদী থেকে কোটি কোটি মাছ ও মাছের পোনা নতুন জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে। কৈ মাছের মতো কিছু প্রজাতি ভিজা ঘাস ও কাদা বেয়ে অনেক দূর হেঁটেও নতুন জলাশয়ে চলে যেতে পারে।
৩. পাখিদের মাধ্যমে ডিমের স্থানান্তর
হাঁস, বক বা পানকৌড়ির মতো জলচর পাখি যখন কোনো ভরা জলাশয়ে খাবার খুঁজতে যায়, তখন তাদের পা, পালক কিংবা ঠোঁটে মাছের আঠালো ডিম বা সূক্ষ্ম রেণু আটকে যায়। সেই পাখি যখন নতুন পানি জমা কোনো শুকনা জলাশয়ে এসে বসে, তখন ডিমগুলো পানিতে ধুয়ে মুক্ত হয়। পরবর্তীতে অনুকূল পরিবেশে সেগুলো ফুটে নতুন পোনা তৈরি হয়।
৪. কাদায় টিকে থাকা প্রতিকূলতা-সহনশীল ডিম
কিছু ক্ষুদ্র প্রজাতির মাছ শুকনা মৌসুমে টিকে থাকার জন্য বিশেষ ধরনের ডিম পাড়ে, যাকে ড্রাউট-রেজিস্ট্যান্ট এগস (Drought-resistant eggs) বলা হয়। জলাশয়ের পানি একদম শুকিয়ে গেলেও এই ডিমগুলো ভেজা মাটির আর্দ্রতা ধরে রেখে মাসের পর মাস জীবিত থাকে। নতুন বৃষ্টি পাওয়ার সাথে সাথেই এগুলো ফুটে বাচ্চা বের হয়।
পার্ট ২: বৃষ্টির সাথে আকাশ থেকে কি সত্যিই মাছ পড়ে?
মাছ শুকনা মাটি ফুঁড়ে বের হওয়ার রহস্যের বাইরে আরও একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে—আকাশ থেকে মাছ বৃষ্টি! শুনতে রূপকথা মনে হলেও এটি একটি প্রমানিত ও বিরল আবহাওয়াজনিত ঘটনা।
হন্ডুরাস, অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সময় বৃষ্টির সাথে নদী বা সমুদ্রের মাছ মাটিতে আছড়ে পড়ার সত্যতা পাওয়া গেছে। কিন্তু আকাশ থেকে মাছ কীভাবে পড়ে?
১. ওয়াটারস্পাউট বা জলস্তম্ভ (Waterspout)
মাছ বৃষ্টির মূল কারণ হলো জলস্তম্ভ। যখন কোনো শক্তিশালী টর্নেডো বা ঘূর্ণিবায়ু নদী বা সমুদ্রের ওপর দিয়ে অতিক্রম করে, তখন পানির ওপর এক ধরনের শক্তিশালী ঘূর্ণি স্তম্ভ বা ওয়াটারস্পাউট তৈরি হয়।
এই ঘূর্ণির চোষক ক্ষমতা বা সাকশন ফোর্স এত তীব্র থাকে যে, এটি জলাশয়ের উপরের স্তরের পানি সহ ছোট ছোট মাছ, ব্যাঙ বা অন্যান্য জলজ প্রাণীকে ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের মতো চুষে ওপরের মেঘের স্তরে নিয়ে যায়।
২. বহু দূরে ছিটকে পড়া
বাতাসের প্রবল ধাক্কায় মাছগুলো মেঘের সাথে উঁচুতে উঠে যায় এবং বাতাসের টানে বহু মাইল দূরে ভেসে চলে যায়। পরবর্তীতে যখন টর্নেডোর শক্তি কমে যায় কিংবা মেঘ থেকে ভারী বৃষ্টি শুরু হয়, তখন আকাশে আটকে থাকা সেই মাছগুলো বৃষ্টির পানির সাথে মাটিতে ঝরে পড়ে।
৩. কিছু ক্ষেত্রে দৃষ্টিভ্রম
অনেক সময় মানুষ সত্যি সত্যি আকাশ থেকে মাছ পড়তে না দেখলেও ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। যেমন—কৈ মাছ বৃষ্টির দিনে ভিজা মাটি দিয়ে এক জলাশয় থেকে অন্য জলাশয়ে যাওয়ার সময় মানুষ মনে করে তা আকাশ থেকে পড়েছে। আবার অতিরিক্ত বন্যায় ড্রেন বা খাল উপচে রাস্তায় মাছ চলে এলে বৃষ্টি থামার পর সেগুলোকে দেখেও অনেকে মাছ বৃষ্টি ভেবে ভুল করেন।
উপসংহার
প্রকৃতি তার প্রতিটি জীবের টিকে থাকার জন্য অদ্ভুত কিছু কৌশল দিয়ে রেখেছে। মাটি ফুঁড়ে হঠাৎ মাছের আত্মপ্রকাশ কিংবা আকাশ থেকে মাছের আগমন—দুটি ঘটনার পেছনেই রয়েছে প্রকৃতির ভারসাম্য ও বৈজ্ঞানিক নিয়মের অদ্ভুত খেলা। অলৌকিক মনে হলেও এর পুরোটাই বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার অংশ।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন